কিভাবে সুখী হওয়া যায়।

সুখ একটা আপেক্ষিক ব্যাপার অর্থাৎ একেক জনের কাছে একেক রকম।আপনার সুখ আপনার কাছ থেকে শুরু হয়। সুখ তৃপ্তি থেকে আসে। এখন কেউ যদি হাজার কোটি টাকার মালিক হয়ে ও বলে যে এই টাকাগুলো কিছুই না। সে আরো চায় ,তার আরো দরকার। এই আরো আরো করতে গিয়ে সে অসুখী যাচ্ছে যা সে নিজেও জানে না বা জানতে চাচ্ছে না। অন্যদিকে কেউ একজন দিন এনে দিন খেলেও সে মনে করছে সে ভালো আছে,সুস্থ আছে – সে সুখী। তাহলে কী বুঝা গেলো ? সুখ শুরু হয় নিজের ভেতর থেকে। নিজের চিন্তা থেকে। চলুন সুখী হওয়ার মন্ত্রগুলো কী কী দেখে নিই।

১। জীবন নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা : আমরা প্রতিনিয়ত এটা সেটা পেতে চাই যা খারাপ কিচ্ছু না। স্বপ্ন থাকা বা কোনো কিছু পেতে চাওয়া ভালো একটা ব্যাপার। এতে মন উৎফুল্ল থাকে,কিন্ত একটা জিনিস আপনি খেয়াল করেছেন কি ? আপনি আজ পর্যন্ত যা পেয়েছেন তার জন্য আপনি কৃতজ্ঞ নন। আপনি একটা জিনিস পাচ্ছেন না এর জন্য কিন্ত আপনি অসুখী না ,আপনি অসুখী কারণ আপনি যা পেয়েছেন তার জন্য কৃতজ্ঞ না। চাওয়া-পাওয়ার আনন্দ বেদনা থাকা স্বাভাবিক কিন্ত যা পেয়েছেন বা পাচ্ছেন তার জন্য একটি বারের জন্য কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে দেখেন কতটা সুখ অনুভব করেন। এখন যদি বলেন ,আমার তো কিছুই নাই। আমি কী নিয়ে কৃতজ্ঞ থাকবো? এটা খুব অসুন্দর কথা যে আপনার কিছুই নেই।আমি যদি বলি আপনি এই যে মুহূর্তটাতে নিঃশ্বাস নিলেন তার জন্য সৃষ্টিকর্তার নিকট কৃতজ্ঞতা না জানিয়ে আমার কিছু নেই বলে অভিযোগ করলেন। প্রত্যেকটা মুহূর্তে অসংখ্য মানুষ এই সুন্দর ধরণী ছেড়ে চলে যাচ্ছে। আপনি আমি এখনো জীবিত এটা কম কিসের? জীবনের সব রং দেখতে পাওয়া,জগতের সব সুন্দর অবলোকন করা আর প্রানভরে নিঃশ্বাস নেয়া কিন্ত খুব হালকা জিনিস না ,এইসবগুলোর জন্য আমরা কৃতজ্ঞ থাকা উচিত।

২। অতীত ও ভবিষৎ নিয়ে না ভাবা : অতীত বা ঘটে গিয়েছে তা নিয়ে আমরা চিন্তা করি যে ওই কাজটা ঐভাবে করতে পারতাম ,ওইটা ঐভাবে হতে পারতো ,কেন আরো একটু বেশি পড়লাম না – এরকম নানান চিন্তা আমাদের ভাবায় অনেক আর পোড়ায়। আপনি জ্বলে পুড়ে ছাড়খার হয়ে যান যখন অতীতের এই বিষয়গুলো নিয়ে চিন্তা করেন।আবার ভবিৎষত নিয়ে চিন্তা করে আমরা আমাদের বর্তমান সুখ নষ্ট করে দেয়। আগামীর জন্য চিন্তা করা বুদ্ধিমানের কাজ কিন্ত আমরা বুদ্ধিমান হতে গিয়ে কিভাবে যেন অসুখী হয়ে যাই টেরই পাই না। আমি বলছি না আগামীর চিন্তা বাদ দিয়ে সুখী হতে। অবশ্যই কালকের জন্য চিন্তা করতে হবে এবং একটু একটু করে এগিয়ে যেতে হবে স্বপ্ন নিয়ে ;দুঃশ্চিন্তা নিয়ে নয়। খুব বেশি দীর্ঘ স্বপ্ন দেখতে যাবেন না কারণ এটা হতাশা তৈরী করে। বড় স্বপ্নকে টুকরো টুকরো করে ভেঙে নিন। প্রত্যেকটা টুকরো যখন সত্যে পরিণত হবে তখন এগুলো সফলতা মনে হবে এবং এগুলোই সফলতা।একটু ভেবে দেখেন আজকের এই দিনটা একসময় অতীত হবে আর এই দিনটি একদিন ভবিৎষত ছিল। তাই অতীত ও ভবিৎষত নিয়ে খুব বেশি চিন্তা না করে আজকের দিনটাকে খুব ভালোভাবে কাজে লাগান। আজকের দিনটার উপর অতীত ও ভবিৎষত নির্ভর করে। একটা কথা না বললেই নয়,আপনি যদি আনন্দে না থাকেন তবে কোনো ভালো কাজ আপনাকে দিয়ে সম্ভব না। আর চিন্তা করে দেখেন যে ব্যাপারে আমাদের হাত নেই অর্থাৎ কন্ট্রোল নেই সে বিষয় গুলো নিয়ে চিন্তা করে আমাদের কী করার আছে ? তাই আমাদের উচিত অতীত ও ভবিষৎ নিয়ে না ভাবা তাহলে সুখ নামক সহজ জিনিসটা সহজে চলে আসবে।

৩। সম্পর্কের মূল্য দেয়া : আমরা মানুষ জন্মলগ্ন থেকে সম্পর্কের বেড়াজালে আবদ্ধ। এই বেড়াজাল বড়ই আদুরে আর মায়ার। অনেক ভালোবাসার আর প্রাণের। এই সম্পর্কের বেড়াজাল থেকে আমরা আস্তে আস্তে বের হয়ে আসি ক্রমান্বয়ে। আসলে বের হয়ে আসি না। সময় ও বাস্তবতা আমাদেরকে বের করে আনে। আমরাও সময়ের সাথে তাল মিলাতে গিয়ে সম্পর্কগুলোকে শিথিল করে ফেলি।আর যেই মুহূর্তকে আমাদের সম্পর্কে শিথিলতা শুরু হয় ঠিক তখন থেকে আমরা একটু একটু অসুখী হতে থাকি। একটা উদাহরন দিলে একটু পরিষ্কার হবে । মনে করুন , আপনার সুন্দর একটা শৈশব কেটেছে চাচাত বা মামাত ভাই-বোনদের সাথে কিন্ত এখন সময় ও বাস্তবতার কারণে আপনি তাদের সাথে যোগাযোগ করতে পারেন না বা চাচ্ছেন না তাহলে আপনি শৈশবকে নিয়ে ভাবছেন না বা আপনার ভাবনায় আসছে না। আর একজন মানুষের সবচেয়ে সুন্দর সময় হচ্চে তার ফেলে আসা দিনগুলি বিশেষ করে শৈশব। আপনি তাদের সাথে যোগাযোগ করলে শৈশব নিয়ে কথা হতো,অনেক মঝার স্মৃতি মনে হতো যেগুলো আপনাকে হাসাতো। সবচেয়ে কষ্টের বিষয় মানুষ আজকাল পরিবারের মানুষের সাথে ও যোগাযোগ করে না। এত ব্যাস্ততা কার জন্য ? আপনার সফলতা এই মানুষগুলো অন্যকে বলে আর আপনাকে নিয়ে গর্ব করে। আপনার কষ্টের সময় এরা সমান কষ্টে জর্জরিত হয়। আজকাল আমরা যান্ত্রিক হয়ে যাচ্চি যা আমাদের অসুখের কারণ। যন্ত্রের প্রাণ আছে ? যন্ত্রের মন আছে ? যন্ত্রের সুখ আছে ?

৪। ভালো কাজ করা : দিন শেষে আমরা রক্ত-মাংসের মানুষ। মানুষ জগতের সকল প্রাণীর থেকে শ্রেষ্ট তার অনুভূতির জন্য। আমরা যখন কোনো ভালো কাজ করি তখন আমাদের ভেতরে এক ধরণের ভালোলাগা কাজ করে। এই ভালো লাগা থেকে সুখের আবির্ভাব হয়। আসলে সুখ খুব বড় কিছু না কিন্ত। সুখ আমাদের চারপাশেই । একজন ভিক্ষুককে এক টাকার একটা নোট দেন। যে হাসিটা হাসবে তার জন্য আপনার অবশ্যই ভালো লাগবে।এই ভালো লাগাই সুখ।

৫। নিজেকে কারো সাথে না মেলানো : আমরা প্রতিনিয়ত অন্যের সাথে নিজেকে মেলাতে গিয়ে বোকামীটা করি। এই জগতে কেউ কারো মত নয়। আমরা সবাই নিজের মত। এক মায়ের পাঁচটা ভাইবোন এক হয় না আর আমি ,আপনি আর সে কিভাবে এক হবে ? সবার আনন্দের বিষয় ও এক না। আমি লিখতে ভালোবাসি,আপনি গাইতে । রবীন্দ্রনাথের ছেলে রবীন্দ্রনাথ হতে পারে না আবার বিল গেটস এর ছেলে ও বিল গেটস হয় না।আমরা যখন থেকে নিজেকে অন্যের সাথে মেলানো বন্ধ করবো ঠিক তখন থেকে সুখের সূচনা হবে।

৬। গন্তব নির্ধারণ : আপনি যখন গন্তব নির্ধারণ করবেন বা গোল সেট করবেন তখন দেখবেন আপনার গোল আপনাকে তাড়া করছে। আপনি যদি খুব শক্তভাবে গোল নির্ধারণ করতে পারেন তবে দেখবেন আপনি এত খুশি থাকবেন যে রাতের ঘুম লেটমর্নিং পর্যন্ত গড়াচ্ছে না।ফালতু সময় নষ্ট হচ্ছে না। প্রানবন্ত আর জীবনীশক্তি আপনাকে ঘিরে ফেলবে। সুতরাং,গন্তব বা গোল নির্ধারণ হচ্ছে ও সুখী থাকার উপায়।

৭। ফলাফল কল্পনা করা : আপনি যখন গোল নির্ধারণ করবেন তখন তো আপনা আপনি একটা ফলাফল চোখের সামনে চলে আসে। এই গোলটা সম্পন্ন করার পর ফলাফলটা এমন হবে,আমার অনভুতি এইরকম হবে ,আমার অবস্থান ওই জায়গায় যাবে …… এরকম অনেক কল্পনা চলে আসার কথা,না আসলে কল্পনায় এইগুলো আনতে হবে তাহলে ও সুখী থাকা যায়। উদাহরণ:আপনি গন্তব নির্ধারণ করলেন যে আপনি একজন পেইন্টার হবেন। গন্তব বা গোল নির্ধারণের পরে কল্পনা করতে লাগলেন যে আপনার ছবিগুলো বাংলাদেশ ছুঁয়ে যাচ্ছে। দেশের গন্ডি পেরিয়ে বিদেশে সুনাম কুড়াচ্ছে। আপনার একেকটা ছবি লক্ষ্ লক্ষ টাকায় বিক্রি হচ্ছে। আপনার নাম স্বনামধন্য জয়নুল আবেদীনের পাশে স্থান পাচ্ছে। ভাবতেই গায়ের লোম খাড়া হয়ে যাচ্ছে না ? অনুভূতি ঘিরে ফেলছে না ? এইরকম আপনি যে পথে যেতে চান সে পথের একটা নির্দিষ্ট গন্তব নির্ধারণ করেন আর কল্পনা করতে থাকেন। দেখবেন কল্পনা বা স্বপ্নরা বাস্তবে ডানা মেলছে।গোল বা স্বপ্ন অবশ্যই বড় করে দেখা উচিত। “মানুষ তার স্বপ্নের সমান “- আব্দুল্লাহ আবু সায়েদ স্যার।যত বড় গোল আপনার তত বড় মানুষ আপনি। বড় গোলকে ছোট ছোট করে নিলে গোলে পৌঁছা খুব সহজ হয়ে যায়। যখন একটা ছেলে/মেয়ে ক্লাসের ফার্স্ট-বয় অথবা ফার্স্ট-গার্ল হয় তখন সে কিন্ত এক লাফে ফার্স্ট হয়ে যায় নি। সে আগে প্রথম সাময়িক পরীক্ষায় ভালো করে,পরে অর্ধবার্ষিকে আবার ভালো রেজাল্ট করে। সবশেষে বার্ষিক পরীক্ষায় সবচেয়ে ভালো করে ফার্স্ট হয়। গোল কিন্ত ছিল ক্লাসের ফার্স্ট হওয়া। সেই গোলকে সিস্টেম নিজেই ভাগ করে দিয়েছে ছাত্রছাত্রীর জন্য। এইভাবে বড় বড় গোলকে ধাপ করে নিলে মানসিক প্রশান্তি কাজ করে আর মোটিভেটেড থাকা যায় কারণ এই ছোট ছোট ধাপগুলোও আপনার গোল বা গোলের একেকটা অংশ।

৮ । ইতিবাচক মানুষের সাথে থাকা : ইতিবাচকতাই সুখ। আমার এই নেই,সেই নেই ,এইটা হলো না ,সেটা হলো না ,না এমন হওয়ার কথা নয় …….এই টাইপের মানুষের কাছ থেকে যত পারা যায় দূরে থাকতে হবে। এরা নিজেও জীবন নিয়ে খুশি না,আপনাকেও খুশি থাকতে দিবে না। ইতিবাচক মানুষের কাছে থাকুন,দেখবেন হতাশা ঘিরে ফেলবে না। ভালো থাকবেন। জীবনে আনন্দে থাকাই সফলতা। আনন্দে থাকাই মোটিভেশন।
৯ । স্পর্শের বাইরের জিনিস নিয়ে চিন্তা না করা : আমরা অনেক সময় আমাদের নাগালের বাইরের জিনিস নিয়ে ভয়ে থাকি। যদি ব্যাবসায় লস করি,যদি আমার গার্লফ্রেন্ড/বউ আমার সাথে চিট করে,যদি আমার খারাপ কিছু হয়ে যায়……..এই রকম অনেক ভয় চলে আসতে পারে যে গুলো আমাদের হাতের নাগালে নয় অথচ এইগুলো পরিবর্তনের জন্য বা এইগুলো এড়িয়ে চলার জন্য আমরা প্রানপন চেষ্টা করি। কিছু জিনিস আমরা চাইলেও হাতের স্পর্শে আনতে পারবো না। সুতরাং স্পর্শের বাইরের জিনিস নিয়ে চিন্তা করা যাবে না।

১০। আমরা একদিন চলে যাবো : একবারের জন্য চিন্তা করে দেখেন যে আমার এই পৃথিবীতে একটা নির্দিষ্ট সময়ের জন্য এসেছি। এই পৃথিবীর সবকিছুই নশ্বর। এই জীবন একটাই। কেন এত হতাশ থাকবো ? কেন আমি শুধু শুধু অসুখী থাকবো ? নিশ্বাস বন্ধ হয়ে গেলে তো সব শেষ। একদিন আমরা চলে যাবো এই জিনিসটা মনে মনে মেনে নিয়েছি অথচ পরীক্ষার খারাপ রেজাল্টের জন্য মন খারাপ করি যা খুবই সাময়িক। পরীক্ষায় খারাপ হতে পারে ,অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ হয়ে যেতে পারে ,খারাপ কিছু ঘটতে পারে কারণ এটা জীবন। এখানে অনেক কিছুই ঘটে। আমরা যেমন মৃত্যুর মত সত্যকে মেনে নিয়েছি মনে মনে তাহলে এই জীবনে ঘটে যাওয়া খারাপ জিনিসগুলোকেও মেনে নিতে হবে ইতিবাচকভাবে। ইতিবাচকতায় সুখ। আর প্রাণ ভরে একবার বলে দেখেন যে আমি আজ ও জীবিত। কৃতজ্ঞ থাকেন প্রত্যেকটা নিঃশাস নিয়ে। আপনি এমনভাবে চিন্তা করলে সুখী না হয়ে পারেন না।

Advertisements